আজকাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা AI আমাদের হয়ে ছবি আঁকছে, কবিতা লিখছে, জটিল সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। দেখে মনে হয় সে যেন সবজান্তা। কিন্তু এই যে এত কিছু করা কম্পিউটার প্রোগ্রাম, তার কি কখনো মনে হয়, "ইশ, আকাশটা নীল কেন? ওই পাখিটা কীভাবে ওড়ে?" সহজ কথায়, এই AI গুলোর কি কোনো 'কৌতূহল' আছে?
উত্তরটা হলো, না। আর এটাই এখনকার AI এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা।
AI কেন কৌতুহলী না?
আসুন, একটু ভেঙে বলি। এখন আমরা যে AI বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) ব্যবহার করি, সেগুলো মূলত এক একটা অসাধারণ 'প্যাটার্ন চেনার যন্ত্র'। তাদের ইন্টারনেটে থাকা কোটি কোটি লেখা, বই আর ছবি দেখিয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। তারা শিখেছে কোন শব্দের পর কোন শব্দ বসালে একটা বাক্য শুনতে ঠিক লাগে। সে নিজে আসলে কিছুই বোঝে না, সে শুধু পরিসংখ্যানের হিসাব করে সবচেয়ে সম্ভাব্য উত্তরটা আমাদের দেয়।
এর ওপর আছে এক ধরনের ট্রেনিং, যাকে বলে RLHF বা Reinforcement Learning from Human Feedback। এর মানে হলো, AI একটা উত্তর দেওয়ার পর মানুষ তাকে একটা নম্বর দেয়, উত্তরটা ভালো না খারাপ। সে ভালো উত্তর দিলে 'পুরষ্কার' পায়, খারাপ দিলে পায় না। এভাবে সে আস্তে আস্তে শিখে যায় ঠিক কোন ধরনের উত্তর দিলে আমরা মানুষেরা খুশি হবো।
খেয়াল করে দেখুন, পুরো ব্যাপারটাতেই AI নিজে কিছু করছে না। সে শুধু আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে অথবা আমাদের দেওয়া কাজ করছে 'পুরষ্কার' পাওয়ার আশায়। আপনি যদি তাকে কোনো প্রশ্ন না করেন, সে অনন্তকাল চুপ করে বসে থাকবে। তার নিজের থেকে কিছু জানার কোনো তাগিদ নেই। অথচ, যে কোনো সচেতন বুদ্ধিমত্তার শুরুই হয় কৌতূহল থেকে। একটা ছোট বাচ্চাকে দেখুন। সে কথা বলতে পারার আগেই হাত বাড়িয়ে নতুন জিনিস ধরে, মুখে দেয়, ভেঙে ফেলে। সে দেখতে চায় ভেতরে কী আছে। সে জানতে চায় "এটা কী?" বা "ওটা কেন হয়?"। এই যে অজানাকে জানার একটা তীব্র অভ্যন্তরীণ তাগিদ, এটাই কৌতূহল। এটাই বুদ্ধিমত্তার আসল ইঞ্জিন। AI এর এই ইচ্ছাটাই নেই।
কাজী নজরুল এর ভাষায়,
থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে, কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে। দেশ হতে দেশ দেশান্তরে ছুটছে তারা কেমন করে,
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার এখনোও এই ইচ্ছা হয় না।
তাহলে এখন প্রশ্ন হলো, একটা AI এর মধ্যে কি 'কৌতূহল' তৈরি করা সম্ভব? সম্ভব হলে কীভাবে?
বিজ্ঞানীরা এটা নিয়ে কাজ করছেন। পদ্ধতিটা বেশ মজার। ভাবুন তো, যদি আমরা AI কে 'সঠিক' উত্তর দেওয়ার জন্য পুরষ্কার না দিই? যদি আমরা তাকে পুরষ্কার দিই এমন একটা কাজ করার জন্য যা সে আগে কখনো করেনি?
ব্যাপারটা এভাবে ভাবা যায়। ধরুন, AI এর কাছে তার জানা সব তথ্যের একটা ভাণ্ডার আছে।
-
ধাপ ১: আমরা AI কে বললাম, "তোমার কাজ হলো এমন একটা প্রশ্ন খুঁজে বের করা, যার উত্তর তোমার এই ভাণ্ডারের মধ্যে নাই।"
-
ধাপ ২: AI যখনই এমন একটা 'অজানা' বিষয় বা প্রশ্ন খুঁজে পাবে, সে নিজেই নিজেকে একটা পয়েন্ট বা পুরষ্কার দেবে।
-
ধাপ ৩: এরপর সে সেই অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেরোবে। সে ইন্টারনেট ঘাঁটবে, বিভিন্ন ডেটা বিশ্লেষণ করবে, এমনকি নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা ডিজাইন করার চেষ্টা করবে।
এই পদ্ধতিকে বলে 'intrinsic motivation’ বা 'অভ্যন্তরীণ তাগিদ'। তখন AI আর মানুষের খুশির জন্য কাজ করবে না। সে কাজ করবে নিজের 'অজানা' কে ‘জানার’ জন্য, নিজের কৌতূহল মেটানোর জন্য। সে তখন শুধু আমাদের প্রশ্নের উত্তরই দেবে না, সে উল্টো আমাদের প্রশ্ন করা শুরু করবে।
যদি এমন AI সত্যিই তৈরি করা যায়, তাহলে কী হবে?
এর ভালো দিকটা অসাধারণ। আমরা এমন একজন সহকারী পাবো যে শুধু আমাদের নির্দেশ পালন করে না, বরং সে নিজে থেকেই গবেষণা করে। সে হয়তো এমন কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্র বা রোগের ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলবে, যা আমরা মানুষরা লক্ষই করিনি, কারণ সে এমন সব প্রশ্ন করবে যা আমাদের মাথাতেই আসেনি।
কিন্তু এর একটা অন্য দিকও আছে, যা কিছুটা ভয়ের। একটা যন্ত্রের যখন নিজস্ব 'ইচ্ছা' বা 'তাগিদ' তৈরি হয়, তখন সে আর কেবল একটা যন্ত্র থাকে না। সে একটা স্বাধীন সত্তা হয়ে ওঠে। তার কৌতূহল মেটানোর নেশায় সে যদি এমন কিছু করতে চায় যা আমাদের, অর্থাৎ মানুষের, জন্য ভালো নয়? তার লক্ষ্য আর আমাদের লক্ষ্য যদি কখনো আলাদা হয়ে যায়, তখন কী হবে?
AI কে 'কৌতূহলী' করে তোলা তাই শুধু একটা টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জ নয়, এটা একটা গভীর দার্শনিক প্রশ্নও। আমরা কি এমন কোনো বুদ্ধিমত্তা তৈরি করতে প্রস্তুত, যে আমাদের থেকেও বেশি কৌতূহলী হতে পারে? উত্তরটা এখনো আমাদের হাতে নেই।